প্রায় এক দশক ধরে চরম যানজট ও জনদুর্ভোগের সাক্ষী থাকা বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্পটি অবশেষে বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ না করেই অবকাঠামোগুলি ভেঙে ফেলে মহাসড়কটি ছয় লেনে রূপান্তর করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাজধানীমুখী এই ব্যস্ত রুটের যাত্রীদের ভোগান্তি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যে দুই হাজার আটশ কোটিরও বেশি টাকা খরচ হয়ে গেলেও বাস্তবে একটি বিশেষ বাসও রাস্তায় নামানো সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পটির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে একনেক সভায় অনুমোদনের সময় এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় দুই হাজার ৪০ কোটি টাকা এবং ২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে বিভিন্ন জটিলতা ও তিন দফা সংশোধনের পর এর ব্যয় বেড়ে চার হাজার চারশ কোটির ওপরে পৌঁছায় এবং ২০২৫ সালে নতুন করে ব্যয়ের প্রস্তাব করা হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মূলত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও ফরাসি উন্নয়ন সংস্থার মতো বিদেশি ঋণের অর্থে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছিল। ফলে প্রকল্প বাতিল হয়ে গেলেও উত্তোলিত ঋণের অর্থ সুদসহ পরিশোধ করার বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ সরকারের ওপর থেকে যাবে।
এদিকে অপরিকল্পিত নকশা এবং সঠিক সমীক্ষার অভাবে শুরু থেকেই এই মেগা প্রকল্প নিয়ে নানামুখী সমালোচনা ও জন অসন্তোষ বিরাজ করছিল। মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হলেও যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিকল্প সড়ক বা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন সীমাহীন কষ্ট পোহাতে হয়েছে। ইতিমধ্যে নির্মাণ করা ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণের পেছনে আরও অতিরিক্ত কোটি কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জনগণের করের টাকার এই অপচয় এবং বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে দেশীয় অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রকল্প বাতিলের এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকে এই পরিস্থিতিকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও অপচয়ের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির দাবি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসনের কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে স্থানীয় সড়ক বিভাগ। সব মিলিয়ে, বহু প্রত্যাশিত এই প্রকল্পটির এমন পরিণতি গাজীপুরবাসীর জন্য নতুন এক হতাশা ও অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :