বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুষ্টিয়ার আহবায়ক শ্রেষ্ঠ, সদস্য সচিব আলী
ছাত্রদল সভাপতি সোহাগ ভূঁইয়ার জন্মদিন উপলক্ষে পথচারীদের মাঝে খাবার বিতরণ
সংসদ নির্বাচনে থাকছে না পোস্টার, এক আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড নয়
দেশ নেত্রী ফোরামের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নভেম্বরে
ইউনিলিভার বাংলাদেশের নতুন সিইও ও এমডি রুহুল কুদ্দুস খান
চাঁদপুরে মেঘনায় সারবাহী জাহাজে সাত খুনের ঘটনাকে ‘ডাকাতি’ হিসাবে দেখছেন না নিহতদের স্বজনরা। তাদের দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পুলিশও বলছে, সারসহ কোনো কিছু খোয়া না যাওয়ায় কিছুটা রহস্য তৈরি হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও প্রাথমিক তদন্তে নেমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, এর পেছনে ‘ভিন্ন কোনো’ কারণ থাকতে পারে। এটি নিছক ডাকাতি নয়।
তারা বলছেন, শুধু লুটপাটের জন্য গলা কেটে একসঙ্গে এত মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা অস্বাভাবিক। এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে চাঁদপুর মর্গ থেকে নিহতদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন, নৌপুলিশের এসপি সৈয়দ মুশফিকুর রহমান ও জেলা পুলিশ কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।নিহতদের স্বজনদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। নৃশংস এ হতাহতের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। সোমবার বিকালে হাইমচরের মাঝেরচর এলাকায় জাহাজের ভেতর থেকে নিহতদের মরদেহ ও এক আহতকে উদ্ধার করে কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশ।
তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত হাইমচর থানায় মামলা হয়নি। জেলা প্রশাসক বলেছেন, চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা হিসাবে হাইমচর থানায় মামলা হবে। লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান চাঁদপুর নৌপুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান। তিনি পুলিশ কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন।
পুলিশ সুপার মুশফিকুর রহমান বলেন, এটি প্রাথমিকভাবে ডাকাতি বলে মনে হচ্ছে না।কারণ,ডাকাতি হলে তো মালামাল নিয়ে যেত। কিন্তু কোনো কিছু খোয়া যায়নি। এমনকি যারা খুন হয়েছেন, তাদের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগও পাওয়া গেছে। যারা কর্মচারী, তারা দরিদ্র মানুষ। তাদের কাছে খুব বেশি টাকাপয়সা থাকার কথা নয়। জাহাজের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস হচ্ছে সার। সেই সার যেভাবে ছিল, সেভাবেই আছে। অনেক সময় জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে, সেটিও ঘটেনি। তাহলে কী কারণে খুনিরা জাহাজে এসেছিল-এমন প্রশ্নে পুলিশ সুপার বলেন, দেখুন, এটি একটি নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। ডাকাতির ব্যাপারে সাধারণ যে ধারণা, সেটা এখানে হয়নি। প্রতিটি কক্ষে ঢুকে প্রত্যেককে মাথায় ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। কারও গলা কেটেছে। সাধারণ ডাকাত হলে তো মালামাল নিয়ে চলে যেত। হতে পারে আগে থেকে কোনো শত্রুতা ছিল, সেই শত্রুতাবশত এ ঘটনা ঘটেছে। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বও হতে পারে। তবে যাই কিছু হোক, তদন্ত করে প্রকৃত বিষয় জানা যাবে। এর আগে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে এটি ডাকাতি মনে হচ্ছে না।
আরও পড়ুনঃ এনসিএল টি-টোয়েন্টির প্রাপ্তি যেসব ক্রিকেটার
মুশফিকুর রহমান আরও বলেন, ৮ জন নয়, সেখানে আমরা ৯ জন থাকার খবর পাচ্ছি। এরই মধ্যে আমাদের কাছে আরও নানা তথ্য আসছে। পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ধরেই আমরা এগোচ্ছি। নৌপথে অস্থিরতা তৈরি করতেই এমনটি করা হয়েছে কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ময়নাতদন্তের পর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সোমবার বিকালে হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় মেঘনা নদীতে এমভি আল বাখেরা জাহাজ থেকে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় গুরুতর আহত আরও তিনজনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। ইউরিয়া সার বোঝাই করে জাহাজটি সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়িতে বিসিআইসির ডিপোতে যাওয়ার কথা ছিল।
নিহত সাতজন হলেন-নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার এগারনলি এলাকার আবেদ মোল্লার ছেলে সালাউদ্দিন (৪০), একই উপজেলার পাংখারচর উত্তর এলাকার মাহবুবুর রহমান মুন্সীর ছেলে আমিনুর মুন্সী (৪১), ফরিদপুরের কোতোয়ালি উপজেলার জুয়াইর এলাকার মৃত আনিছুর রহমানের ছেলে মো. গোলাম কিবরিয়া (৬৫), একই এলাকার মৃত আতাউর রহমানের ছেলে শেখ সবুজ (২৭), মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার চরবসন্তপুর এলাকার আনিছ মিয়ার ছেলে মো. মাজেদুল (১৮), একই উপজেলার পলাশবাড়িয়ার দাউদ হোসেনের ছেলে মো. সজিবুল মুন্সী (২৯) এবং মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন মুন্সীর ছেলে রানা কাজী (৩২)। তারা সবাই জাহাজের স্টাফ।
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলেন, আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত হত্যা। তা না হলে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হতো না। আমরা এর বিচার চাই। হত্যার শিকার জাহাজের লস্কর শেখ সবুজের ছোট ভাই সাদিকুর রহমান বলেন, ছোট ভাই সবুজের সঙ্গে একদিন আগে আমার কথা হয়েছে। আমি এই হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি। একই দাবি জানালেন জাহাজের মাস্টার গোলাম কিবরিয়ার ভাই আউয়াল হোসেন। তিনি বলেন, এ মাসেই আমার ভাইয়ের চাকরির মেয়াদ শেষ হতো। তিনি ১ জানুয়ারি থেকে অবসরে যেতেন। ওনার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ের জানুয়ারিতে বিয়ে হওয়ার কথা। কিন্তু এ ঘটনার পর সব পরিকল্পনাই শেষ।
আরও পড়ুনঃটেলিভিশনে সরকারি দখলটা যখন প্রকট হয়ে উঠল, তখন থেকে গ্রহণযোগ্যতা কমতে শুরু করল: আবুল হায়াত
হত্যার শিকার আমিনুল মুন্সীর বড় ভাই মো. হুমায়ুন, ইঞ্জিনচালক সালাউদ্দিনের মামাতো ভাই জাহাঙ্গীর বলেন, ঘটনাটি আমরা ডাকাতি শুনলেও খুনের ঘটনার দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে এটি পরিকল্পিত হত্যা। কারণ, প্রত্যেক নিহতের মাথায় ধারলো অস্ত্রের আঘাত। যারা হত্যার শিকার হয়েছেন, সবারই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জাহাজে পাওয়া গেছে। এমনকি জাহাজে থাকা ৫ জনকে উদ্ধারের সময় তাদেরকে শোয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পর চাঁদপুরের ডিসি মোহাম্মদ মোহসীন উদ্দিন বলেন, আহত একজন হাতের ইশারায় জানিয়েছেন, জাহাজে তারা আটজন ছিলেন। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। ডাকাতি কিংবা অন্য কোনো কারণে হতে পারে। তদন্ত করার পর জানা যাবে। নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেছি। কারণ, এই রুটে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।
এদিকে সারবোঝাই এমভি আল-বাখেরা জাহাজের ক্রু সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা ও আহতের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। কমিটিকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তথ্য জানানো হয়েছে।
নড়াইলে শোকের মাতম : নড়াইল ও লোহাগড়া প্রতিনিধি জানান, হত্যাকাণ্ডের শিকার দুইজনের বাড়ি নড়াইলে। তাদের বাড়িতে এখন চলছে শোকের মাতম। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ইতনা ইউনিয়নের উত্তর পাংখারচর গ্রামের বাসিন্দা মাহবুব রহমান মুন্সীর ছেলে জাহাজের সুকানি আমিনুল মুন্সী এবং ইঞ্জিনচালক লাহুড়িয়া ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার এগারনলী গ্রামের আবেদ মোল্লার ছেলে মো. সালাউদ্দিন মোল্লা।
আরও পড়ুনঃ রাজশাহীর সাবেক যুবলীগ নেতার দোকানঘরে বিএনপি কার্যালয়, মায়ের কবরস্থানে হানার অভিযোগ
মহম্মদপুরের দুই যুবক নিহত, পরিবারে আহাজারি : মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি জানান, নিহত সাতজনের মধ্যে মাগুরার মহম্মদপুরে দুই যুবকের বাড়ি। নিহতরা হলেন সজিবুল মুন্সী ও মাজেদুল ইসলাম। সজিবুল উপজেলার পলাশবাড়িয়া গ্রামের দাউদ মুন্সীর ছেলে এবং মাজেদুল চরবসন্তপুর গ্রামের আনিছুর রহমানের ছেলে। এ ঘটনার খবর জানার পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে এলাকার বাতাস। সমবেদনা জানাতে ছুটে আসছেন সাধারণ মানুষ।
বাঘাবাড়ি নৌবন্দরে বিক্ষোভ : শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, ৭ নাবিককে হত্যার প্রতিবাদ ও চার দফা দাবিতে মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক ফেডারেশন বাঘাবাড়ি শাখার শ্রমিকরা। তারা খুনিদের অবিলম্বে গ্রেফতার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ও চট্টগ্রাম-বাঘাবাড়ি নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
আপনার মতামত লিখুন :