পার্বত্য চট্টগ্রামের জনমিতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং এখানে বহুভাষিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই অঞ্চলে চাকমা ও মারমা সহ মোট এগারোটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা এবং বাঙালি সম্প্রদায় মিলে প্রায় বারোটি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি থাকার কারণে এই অঞ্চলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে কিছুটা আলাদা। পাহাড়ি এই জনপদে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ একসঙ্গে বসবাস করলেও ভাষার ভিন্নতা তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছে।
এলাকাটিতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভাষা একটি অত্যন্ত বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। সরকারি বা বেসরকারি যেকোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে গেলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা না জানার কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী মানুষের সাথে ভাববিনিময়ের অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সেবা বা বার্তা সঠিকভাবে তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এর ফলে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের গতিও অনেক সময় শ্লথ হয়ে পড়ে।
স্থানীয় মানুষের মূল সমস্যা এবং সংকটগুলো চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও এই ভাষা দূরত্ব একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দেয়। অনেক সময় পাহাড়ি অঞ্চলের প্রকৃত চিত্র বা স্থানীয়দের দাবিগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না যোগাযোগের এই ঘাটতির কারণে। ফলে বিভিন্ন সময়ে সৃষ্ট ভুল বোঝাবুঝি বা জটিলতাগুলোর মূল কারণগুলো আড়ালে থেকে যায় এবং টেকসই সমাধান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই বহুমুখী ভাষার সংস্কৃতির মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করা না গেলে সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
পাহাড়ি অঞ্চলের এই ভাষাগত বৈচিত্র্যকে আমলে নিয়ে ভবিষ্যতে যেকোনো পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করতে হলে তাদের মাতৃভাষার প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং দ্বিভাষিক দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী তৈরি করে মাঠপর্যায়ে কাজ পরিচালনা করা প্রয়োজন। তবেই সব সম্প্রদায়ের মানুষের প্রকৃত চাহিদা ও সমস্যাগুলো স্পষ্টভাবে সামনে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদী সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
আপনার মতামত লিখুন :