বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন কুষ্টিয়ার আহবায়ক শ্রেষ্ঠ, সদস্য সচিব আলী
ছাত্রদল সভাপতি সোহাগ ভূঁইয়ার জন্মদিন উপলক্ষে পথচারীদের মাঝে খাবার বিতরণ
সংসদ নির্বাচনে থাকছে না পোস্টার, এক আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড নয়
দেশ নেত্রী ফোরামের পূর্ণাঙ্গ কমিটি নভেম্বরে
ইউনিলিভার বাংলাদেশের নতুন সিইও ও এমডি রুহুল কুদ্দুস খান
চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালানের আলোচিত মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ছয়জনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর ছয় আসামির সাজা কমিয়ে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ওই মামলায় ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আসামিদের আপিলের ওপর শুনানি শেষে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বুধবার এ রায় দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী জানিয়েছেন, খালাসপ্রাপ্তরা এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না। কারণ, একই ঘটনায় অস্ত্র আইনের মামলায় তাদের দণ্ড রয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, এ মামলায় বহুমাত্রিক ঘাটতি ছিল, মামলার তদন্তে ছিল যথেষ্ট গাফিলতি। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল সিইউএফএল ঘাট থেকে আটক করা হয় ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান। এ নিয়ে কর্ণফুলী থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে চোরাচালানের অভিযোগ এনে দুটি মামলা হয়। মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ রায় দেন। বিচারিক আদালতের রায়ে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী (অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর), সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এরপর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। দণ্ডিত ১২ জন পৃথক আপিল করেন। মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) ও আপিলের ওপর ৬ নভেম্বর হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। ১৩তম দিন শুনানি হয়। আসামিদের ডেথ রেফারেন্স নাকচের পাশাপাশি কোনো ক্ষেত্রে আপিল মঞ্জুর; আবার কোনো ক্ষেত্রে আপিল নামঞ্জুর করে সাজা সংশোধন করে বুধবার রায় দেওয়া হয়।
যাদের খালাস দেওয়া হলো : বুধবার মামলাটি শুনানির জন্য ধার্য ছিল। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে এই মামলায় আসামিদের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষ হয়। পরে আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত বলেন, লুৎফুজ্জামান বাবর, রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের (সিইউএফএল) তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন উদ্দিন তালুকদার, তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কেএম এনামুল হক ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। যে কারণে তারা অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার অধিকারী, তাদের খালাস দেওয়া হলো। ওই মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা হয়েছিল। হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, মারা যাওয়ায় তার আপিল মেরিটে নিষ্পত্তি করে অব্যাহতি দেওয়া হলো। মামলাটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শিল্প মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব নুরুল আমিনকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। তার বিষয়ে রায়ে আদালত বলেছেন, বিচারের শুরু থেকেই তিনি পলাতক। তার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। তাই তিনি অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার অধিকারী।
আর ও পড়ুনঃ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুমের সংশ্লিষ্টতার তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছে আমেরিকা
পরেশ বড়ুয়ার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে : বিচারিক আদালতের রায়ে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা হয়েছিল। তার বিষয়ে হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, শুরু থেকেই তিনি পলাতক। তার বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত এবং পারিপার্শ্বিকতা ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে তার সাজা পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হলে ন্যায়বিচার হবে। তাই সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হলো।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড : বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৬ আসামিকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। তারা হলেন-জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা (এনএসআই) সংস্থার তৎকালীন মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান, এনএসআইয়ের সাবেক উপপরিচালক মেজর (অব.) লিয়াকত হোসেন, তৎকালীন পরিচালক উইং কমান্ডার (অব.) সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ, চোরাকারবারি হাফিজুর রহমান, শ্রমিক সরবরাহকারী দ্বীন মোহাম্মদ ও ট্রলার মালিক হাজি সোবহান। বিচারিক আদালতের রায়ে তাদের ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছিল। জরিমানা পরিবর্তন করে তাদের ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
মারা যাওয়ার কারণে ১ জনের আপিল অ্যাবেট (পরিসমাপ্তি) ঘোষণা : মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. আবদুর রহিমের মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা হয়েছিল। তার বিষয়ে রায়ে হাইকোর্ট বলেন, মারা যাওয়ার কারণে তার আপিল অ্যাবেট (পরিসমাপ্তি) ঘোষণা করা হলো। বিচারিক আদালতের দেওয়া জরিমানার আদেশ সংশোধন করে ১০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করা হলো। তার পরিবার এ জরিমানা পরিশোধ করবে।
রায়ের পর্যবেক্ষণ : রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, বিচারের উদ্দেশ্য হচ্ছে মূল অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া। ঘটনা যাই হোক-তদন্ত হতে হবে যথাযথ, বস্তুনিষ্ঠ ও পক্ষপাতহীন। ওই নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে বিচার হতে হবে। তাই আমরা এ মামলায় বহুমাত্রিক ঘাটতি দেখছি। মামলার তদন্তে যথেষ্ট গাফিলতি ছিল। এ ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং সঠিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়নি। তাই কয়েকজন আসামিকে বেকসুর খালাস, কয়েকজনের সাজা কমানো এবং কয়েকজনের সাজা সংশোধন করে রায় দেওয়া হলো।
শুনানিতে যারা যুক্ত ছিলেন : আদালতে মহসীন, এনামুলসহ পাঁচজনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসএম শাহজাহান। নিজামী ও বাবরের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। আবদুর রহিম ও লিয়াকতের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ আহসান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতানা আক্তার রুবী ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসিফ ইমরান জিসান। পলাতক আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাসনা বেগম শুনানি করেন। নুরুল আমিনের পক্ষে আইনজীবী সাধন কুমার বণিক ও মো. মহিউদ্দিন শুনানিতে অংশ নেন।
রায়ের প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার পর লুৎফুজ্জামান বাবরের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ১০ ট্রাকসংক্রান্ত অপর একটি মামলায় দণ্ড থাকায় এখনই বাবর কারামুক্তি পাচ্ছেন না। ওই মামলায় বাবরের করা আপিল হাইকোর্টে শুনানির জন্য রয়েছে। তিনি বলেন, এ মামলায় ১৪ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। তাদের ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে আজকে রায় হয়েছে। চারজন মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে খালাস পেয়েছেন। পলাতক নুরুল আমিনও খালাস পেয়েছেন। এরই মধ্যে মৃত্যুবরণ করায় মতিউর রহমান নিজামী ও আব্দুর রহিমের আপিল অ্যাবেটেড (বাদ) হয়ে গেছে। বাকি ছয়জনকে ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। ভারত চলে যাওয়া পরেশ বড়ুয়াকে যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছেন। লুৎফুজ্জামান বাবরের বিষয়ে শিশির মনির বলেন, দ্বিতীয় তদন্তের ভিত্তিতে তাকে প্রধান আসামি করা হয়। তাকে আজকে খালাস দিয়েছেন একথা বলে-তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিকটিম। তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ কেউ হাজির করতে পারেননি। জামায়াতের সাবেক আমিরের বিষয়ে শিশির মনির বলেন, আমরা মতিউর রহমান নিজামীর পক্ষে ছিলাম। তিনি মৃত্যুবরণ করায় মামলাটা অ্যাবেট হয়ে গেছে। কিন্তু যে জরিমানা ছিল সেটা থেকে অন মেরিটে খালাস করে দিয়েছেন। মূলত তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ফলে এ মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। আসামিদের আইনজীবী এসএম শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ মামলার শুরু থেকেআদালতকে বলেছি, এই অস্ত্রগুলো কোত্থেকে এসেছে, কোথায় যাবে, এগুলোর বাহক কারা। এটা যদি চোরাচালানের জন্য আনতে হয়, তাহলে বাংলাদেশের আইনে প্রমাণ করতে হলে দেখতে হবে যে, আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য আনা হয়েছে। কিন্তু এখানে বিচারিক আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, অস্ত্রগুলো পার্শ্ববর্তী কোনো দেশে পাচার করার জন্য আনা হয়েছে। আমরা এটাই বলার চেষ্টা করেছি। কোর্টের কাছে ন্যায়বিচার পেয়েছি। আইনজীবী বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার মতো এ মামলাতেও প্রথম একটি তদন্তের পর ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর সরকার পরিবর্তনের ফলে আবার তদন্ত ও বিচার পরিবর্তন হয়ে একটি রায় হয়। এ মামলার বিচারিক আদালতে সব আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এটা আমার উকালতি জীবনে কমই দেখেছি।
নেত্রকোনায় আনন্দ মিছিল : নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান মামলায় মৃত্যুদণ্ড থেকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের খালাস পাওয়ায় আনন্দ মিছিল হয়েছে। বাবরের নির্বাচনি এলাকা নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরি) ছাড়াও জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা আনন্দ মিছিল করেন। রায় ঘোষণার পরপরই মদন উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয় থেকে আনন্দ মিছিল বের হয়ে পৌর শহরের প্রধান সড়ক ঘুরে মদন সরকারি হাজি আবদুল আজিজ খান ডিগ্রি কলেজ মাঠে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে মিষ্টি মুখ করা হয়। নেত্রকোনা শহরের ছোটবাজার এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয় থেকে মিছিল শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে একই এলাকায় শেষ হয়।
আপনার মতামত লিখুন :